ঈদ স্পেশাল

রফুর ঈদ আনন্দ

তৌহিদুজ্জামান তৌহিদ

রফুর ঈদ আনন্দ


  • ১২ আগস্ট ২০১৯, ২০:৫৭

মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙে রফিজ মিয়ার। ঈদের দিনের সকাল বলে বস্তির ছেলে মেয়েদের মাঝে একটু বেশিই উচ্ছাস। ঘর থেকে বের হয়েই ছেলেমেয়েদের দৌড়ঝাঁপ দেখল রফু।

ও হ্যাঁ, বস্তির সবাই রফিজ মিয়াকে রফু বলেই ডাকে। সহজ সরল মনের রফু রিক্সা চালায়। আপনজন বলতে কেউ নেই। কোন এক বন্যায় নদীর বুকে টেনে নিয়েছে রফুর পরিবারের বাকি সবাইকে। সে যাত্রায় রফু বেঁচে গিয়েছিল। রফুর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি হয়েছিল মাধ্যমিকে। এ বস্তিতে শিক্ষিত লোকের বড়ই অভাব। রফু যখন রিক্সা চালানোর ফাঁকে বস্তিতে থাকে তখন ছেলেমেয়েদের অ আ ক খ শিখানোর চেষ্টা করে। সেই সূত্রে রফু রিক্সা চালক হলেও বাচ্চাদের কাছে তাদের শিক্ষকও বটে। তাই তো ঈদের দিনে সবাই কিছু না কিছু হাতে নিয়ে রফুর কাছে এসেছে। রফু সবাইকে দেখে এক গাল হেসে গোসল করতে যায়। গোসল শেষে এসে দেখে কেউ এক প্লেট সেমাই কিংবা কেউ মায়ের হাতে বানানো মোয়া নিয়ে এসেছে। এসবই রফুর জন্য। রফু সেমাই আর দুটো মোয়া খেয়ে সবাইকে আনন্দ করতে বলে রিক্সা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল।

রিক্সা নিয়ে মোড়ে গেলেই রতন ময়রা রফুকে ডেকে বলছে-

: আজও মিয়া রিক্সা নিয়া বের অইয়া পড়ছ?

: হ, দাদা। বাইর না অইলে তো আর ভালা লাগে নাহ।

: তাই কও।

: আচ্ছা, রতন দা, আমারে দুই কেজি রসগোল্লা দ্যাও তো দেহি।

: তুমি রিক্সা লইয়া বাইর অইছ, রসগোল্লা নিয়া কী করবা? আত্মীয় বাড়ি যাবা বুঝি?

: না, তাড়াতাড়ি দাও দেহি।

দুই কেজি রসগোল্লা রিক্সার সিটের নিচে রেখে প্যাডেল দেয় রফু আর গেয়ে উঠে কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত সৃষ্টি - 'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ...' গাইতে গাইতে ট্রাফিক সিগন্যালের পাশে এসে দাড়ায়। সেখানে একজন ট্রাফিক পুলিশ ঠাই দাড়িয়ে আছে। রফিক পুলিশকে ডাক দেয়-

: ভাই, ঈদের দিন ফাকা রাস্তায় কাম কী? বাসায় যাইতান না?

: ভাইরে, আমাদের আর ঈদ? ডিউটি তো করতেই হবে। পরে ছুটি কাটিয়ে নিব।

: কি যে কন ভাই?

রসগোল্লার প্যাকেট বের করে পুলিশের দিকে এগিয়ে-

: ভাই, রসগোল্লা নিন।

: কিসের রসগোল্লা, ভাই?

: আমার তো কেউ নাই, তাই বাইর অইয়া দুই কেজি রসগোল্লা কিনলাম। আপনের মতো যাদের সাথে দেহা অইব তাদের দিমু, নিজেও খামু। এই আর কি!

: আমাদের তো ডিউটি তে খাওয়া নিষেধ তবুও আপনার আশা একটা নিলাম। আপনিও খান ভাই!

পুলিশকে রসগোল্লা খাইয়ে আবার প্যাডেল দেয় রফু। ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে একটু দূরেই বিদ্যুৎ অফিস। সামনে যেতেই রফু দেখল মটর বাইকে করে দুজন কর্মী বের হচ্ছে। তাদের সাথেও কথা বলার চেষ্টা করল রফু।

: ভাই, একটু শুনবেন?

: কি ভাই? কি বলবেন?

: ঈদের দিন কই যান?

: নিজের আনন্দের চিন্তা করে কি হবে ভাই? আমরা তো আপনাদের জন্যই কাজ করি। এই যে দেখুন, ঐ পাশে লাইনে নাকি সমস্যা হয়েছে, লাইন ঠিক করতে যাই।

: আচ্ছা, আচ্ছা।

আবারও রসগোল্লার প্যাকেট বের করে –

: ভাই, আপনারা নেন। আপনাদের মতোই যারা আজ বাড়ি ফিরে নি তাদের জন্যই আমার চেষ্টা।

: ভাই, আপনার মনটা বড়ই ভালো। আসলে ভাই, কাজের ব্যস্ততায় ঈদ আর ঈদ মনে হয় না। আপনার মাধ্যমে আজ যেন ঈদের একটা খুশি খুশি লাগছে।

এভাবে আরও বেশ কিছু মানুষের মাঝে রসগোল্লা বিতরণ শেষে পার্কে গিয়ে বিশ্রাম নিতে গাছতলায় বসে রফু। এমন সময় এক টিভি সাংবাদিক আসে পার্কে। তার সাথেও কথা বলে রফু।

- ভাই, আপনেও বাড়ি যাইতে পারেন নাই?

- না ভাই, কুরবানির ঈদে যাব। এইবার ছুটি পাই নাই।

- ও, আচ্ছা!

- ভাই, রসগোল্লা নেন। ক্যামেরাম্যান ভাই, আপনিও নেন।

- কীসের রসগোল্লা এটা?

- আমি ভাই রিক্সা চালাই, থাকি বস্তিতে। আজকে বের অইছি তাদের দেকবার লাইগা যারা বাড়ি না গিয়া চাকরির কাজে আছে। এই মনে করেন, ট্রাফিক পুলিশ, বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারী, আপনার মতো আরও মানুষ তাদের সাথে কথা বার্তা কমু আর দিনটা কাটামো। খালি মুখে তো আর কথা বলা যাব না তাই রসগোল্লা কিন্যা লইছি। এটাতেই আমার আনন্দ হইছে, বুঝলেন ভাই?

- হুমম, বুঝলাম।

- বুঝলে তো অইব না, রসগোল্লা নেন তারপর আরও কথা অইব।

দীর্ঘক্ষণ গল্প শেষে আরও কোথায় ঘুরে বস্তিতে ফিরে রফু। ফেরার আগে মোড়ের দোকান থেকে বাচ্চাদের জন্য কিছু লজেন্স কিনে নেয়। তখন দেখে দোকানের টিভিতে তাঁকে দেখাচ্ছে। দোকানের বেঞ্চিতে বসা সবাই হা করে তাকিয়ে আছে। রফুও অবাক। পরে বুঝতে পারল ক্যামরাওয়ালা ঐ টিভি সাংবাদিক তার কথাগুলো ভিডিও করেছিল। বস্তিতে ফিরলে বাচ্চাগুলো লজেন্স পেয়ে খুব খুশি হল। আর, বাচ্চাদের হাসি মুখেই যেন রফুর পরিবারের হাসির ছায়া রেখা ফুটে উঠে। এই আনন্দ যেন আর শেষ হবার নয়, এই ঈদানন্দ যেন রফুর নিরবচ্ছিন্ন ভালোবাসার প্রস্ফুটন।

মানবকণ্ঠ/আরএ




Loading...
ads




Loading...