১৯৭০ থেকে ২০০০ সাল

একজন হুমায়ূন এবং তাঁর পথচলা

নাজমুল হক ইমন



  • ২১ জুলাই ২০১৯, ২১:৫০

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার এবং  নাট্য ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সৃষ্টিমুখর বর্ণাঢ্য জীবন তাঁর। তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয় এ লেখক বাংলা সাহিত্যে সংলাপ নির্ভর নতুন ধারার জনক। তিন শতাধিক প্রকাশিত গ্রন্থের এই লেখক ২০১২ সালের ১৯ জুলাই অন্যভূবনে প্রস্থান করেন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন নাজমুক হক ইমন।    

১৯৭০-এর দশক  

নন্দিত নরকে ও শঙ্খনীল কারাগার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনে একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের শুরু। এই উপন্যাসটির নাম নন্দিত নরকে। ১৯৭১-এ মুক্তিযু" চলাকালে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২-এ কবি-সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রখ্যাত বাংলা ভাষাশাস্ত্র পন্ডিত আহমদ শরীফ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিলে বাংলাদেশের সাহিত্যামোদি মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। বইটির প্রচ্ছদ করেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ভাস্কর শামীম শিকদার। উপন্যাসটি লেখক শিবির হতে বর্ষসেরা উপন্যাসের পুরস্কার লাভ করে। শঙ্খনীল কারাগার তার লেখা প্রথম উপন্যাস কিন্তু প্রকাশিত ২য় গ্রন্থ। তার রচিত তৃতীয় উপন্যাস বিজ্ঞান কল্পকাহিনীমূলক তোমাদের জন্য ভালোবাসা।

অধ্যাপনা ও পিএইচডি

১৯৭৩ সালে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বেতন ছিল ৬৫০ টাকা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় তিনি তার প্রথম ছোটগল্প রচনা করেন। সৌরভ নামক গল্পটি বিচিত্রা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে যোগদান করেন। এই বছর বিচিত্রা পত্রিকায় ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তার রচিত উপন্যাস অচিনপুর। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন।

বিবাহ

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৬ সালে গুলতেকিনকে বিয়ে করেন। গুলতেকিন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর নাতনী। এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং এক ছেলে। বড় মেয়ে নোভা আহমেদ, মেজো মেয়ে শীলা আহমেদ এবং ছোট মেয়ে বিপাশা আহমেদ। বড় ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ। বাবার মত নুহাশও পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন। অন্য আরেকটি ছেলে সন্তান অকালে মারা যায়। তিনি তার নাম রেখেছিলেন রাশেদ হুমায়ূন।

 

১৯৮০-এর দশক

প্রথম প্রহর ও এইসব দিনরাত্রি

টেলিভিশন নাট্যকার হিসেবে হুমায়ূন আহমেদকে আবিস্কার করেন নওয়াজিশ আলি খান। আহমেদের নন্দিত নরকে ও শঙ্খনীল কারাগার পড়ার পর তিনি একদিন ধানমন্ডির দখিন হাওয়াতে রতœদ্বীপ নাটকের চিত্রায়নকালে খান তার সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি আহমেদকে টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখতে আহŸান জানান। টেলিভিশনের জন্য হুমায়ূন আহমেদের প্রথম কাজ হল টেলিভিশন নাটক প্রথম প্রহর। এটি ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে খান আহমেদ রচিত অসময়, অযাত্রা, বিবাহ, এসো নিপবনে, নিমফুল নাটক প্রযোজনা করেন। আহমেদ রচিত প্রথম ধারাবাহিক নাটক এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫)। নাটকে লিউকোমিয়া আক্রান্ত শিশু চরিত্র টুনিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আহমেদের কাছে এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনে দর্শকের প্রচুর চিঠি আসে কিন্তু আহমেদ তার চিত্রনাট্যে অটল থাকেন।

বহুব্রীহি ও কোথাও কেউ নেই

নওয়াজিশ আলি খানের প্রযোজনায় হুমায়ূন আহমেদ রচিত প্রথম টেলিভিশন ধারাবাহিক বহুব্রীহি। এটি ১৯৮৮-৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। ধারবাহিকটির প্রতিটি পর্ব ছিল বিষয়ভিত্তিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা ছিল বাংলাদেশের টিভি নাটকের অভিনব ব্যাপার। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে কিছু সামাজিক বিষয়, যেমনÑ মিথ্যা না বলা ও পুষ্টি সংরক্ষণের জন্য সপ্তাহে একদিন মাছ না খাওয়া, এবং মুক্তিযুদ্ধকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলে। ধারাবাহিকের একটি সংলাপ ‘তুই রাজাকার’ বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই সময়ে নির্মিত হয় টেলিভিশন নাটক অয়োময়। এই নাটকেই তার কন্যা শীলা আহমেদের অভিনয়ে অভিষেক হয়। আহমেদ এই নাটকের মহড়া, চিত্রায়ণ ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা তাকে পরবর্তীতে পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। তার রচিত আরেকটি অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক হল কোথাও কেউ নেই (১৯৯০)। এই ধারাবাহিকের বাকের ভাই চরিত্রটি তুমুল দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি রুখতে দর্শক ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ সেøাগান দিয়ে মিছিল করে। এমনকি, আহমেদের এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িতে দর্শকেরা আক্রমণ করে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তিনি রমনা থানায় জিডিও করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বহু একপর্বের নাটক নির্মাণ করেছেন। যাদের মধ্যে খেলা, অচিন বৃক্ষ, খাদক, একি কান্ড, একদিন হঠাৎ, অন্যভুবন উল্লেখযোগ্য।

মিসির আলি চরিত্র

মিসির আলি চরিত্রটি আহমেদের মাথায় আসে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরে স্ত্রী গুলতেকিনের সঙ্গে গাড়িতে ভ্রমণকালে। এই ঘটনার অনেকদিন পর তিনি মিসির আলি বিষয়ক প্রথম উপন্যাস দেবী লিখেন। ১৯৮৫ সালে উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে তিনি এই চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচনা করেন নিশীথিনী (১৯৮৭), নিষাদ (১৯৮৮), অন্যভুবন (১৯৮৯) ও বৃহন্নলা (১৯৮৯)। এ ছাড়াও, হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলিকে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস দেবী থেকে ২০১৮ সালে নির্মিত হয় দেবী নামের একটি চলচ্চিত্র। যেটির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মিসির আলির বড় পর্দায় অভিষেক হয়। ছবিটি পরিচালনা করেন অনম বিশ্বাস। এতে মিসির আলির ভূমিকায় অভিনয় করেন চঞ্চল চৌধুরী।

নুহাশ পল্লী

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৮৭ সালে ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পিজুলিয়া গ্রামে ২২ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত বাগান বাড়ি নুহাশ পল্লী গড়ে তুলেন। বাড়িটির নামকরণ করা হয় স্ত্রী গুলতেকিন ও তার প্রথম পুত্র নুহাশ হুমায়ূনের নামে। বর্তমানে এর আয়তন আরো বৃদ্ধি করে ৪০ বিঘা করা হয়েছে। অভিনেতা এজাজুল ইসলাম তাকে এই জমি কেনা ও ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করেন। বাড়িটির সর্ব উত্তরে একটি পুকুর রয়েছে। পুকুরটির নাম ‘লীলাবতী’। এর নামকরণ করা হয় শাওন ও তার অকালপ্রয়াত কন্যার নামে, যে পৃথিবীর আলো দেখার পূর্বে মৃত্যুবরণ করে। পুকুরে একটি কাঠের পুল রয়েছে। পুকুরের মাঝখানে একটি কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে তাবু পোঁতা আছে।

 

১৯৯০-এর দশক

হিমু চরিত্র

হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট হিমু চরিত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে ময়ূরাক্ষী উপন্যাস দিয়ে। ১৯৯০ সালে মে মাসে অনন্যা প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে চরিত্রটি পাঠকদের, বিশেষ করে তরুণ সাহিত্যপ্রেমীদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে একে একে প্রকাশিত হতে থাকে দরজার ওপাশে (১৯৯২), হিমু (১৯৯৩), পারাপার (১৯৯৪), এবং হিমু (১৯৯৫), হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম (১৯৯৬), হিমুর দ্বিতীয় প্রহর (১৯৯৭), হিমুর রূপালী রাত্রি (১৯৯৮), এবং একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা (১৯৯৯) ইত্যাদি। এ ছাড়াও, এই উপন্যাসগুলো নিয়ে হিমু সমগ্র (১৯৯৪), হিমু সমগ্র (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯৯৮), এবং হিমু অমনিবাস (২০০০) প্রকাশিত হয়। হুমায়ূনের লেখায় রাজনৈতিক প্রণোদনা অনুপস্থিত এরকম কথা বলাও হলেও হিমুর লেখার ক্ষেত্রে তা সত্যি নয়।

শুভ্র চরিত্র

শুভ্র চরিত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে দারুচিনি দ্বীপ উপন্যাস দিয়ে। যদিও শুভ্র চরিত্রটি প্রথম আসে তার লেখা একটি ছোটগল্পে, যার নাম ‘শাদা গাড়ি’। দারুচিনি দ্বীপ বইটি অনুপম প্রকাশনী থেকে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয়। শুভ্রকে নিয়ে রচিত তার দ্বিতীয় উপন্যাস হল মেঘের ছায়া। এটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। দারুচিনি দ্বীপ উপন্যাসের গল্পের শেষ থেকে শুরু হয় পরবর্তী উপন্যাস রূপালী দ্বীপ (১৯৯৪)।
শঙ্খনীল কারাগার ও আগুনের পরশমণি

১৯৯২ সালে হুমায়ূন আহমেদ রচিত শঙ্খনীল কারাগার উপন্যাস অবলম্বনে মোস্তাফিজুর রহমান একই নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটি নির্মাণের জন্য পরিচালক বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অনুদান পান এবং আহমেদ চিত্রনাট্য লেখার সম্মানী হিসেবে ১০ হাজার টাকা পান। মুক্তির পর চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে ছবিটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে কিন্তু শাকুর মজিদ কাহিনী, কাহিনীর সময়কাল, সেট ও পোশাকে গড়মিল খুঁজে পান। তবে শঙ্খনীল কারাগার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে এবং আহমেদ শ্রেষ্ঠ কাহিনীকারের পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৪ সালে আগুনের পরশমণি চলচ্চিত্র দিয়ে তার পরিচালনায় অভিষেক হয়। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তিনি ২৫ হাজার টাকা সরকারি অনুদান পান। তিনি মূলত তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু চলচ্চিত্রকার আনিস সাবেতের অকাল মৃত্যুর খবর শোনার পর চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হন। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া শিক্ষকতার চাকরি থেকে অব্যহতি দেন। চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে এবং আহমেদ শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার ও সংলাপ রচয়িতা বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস কবি। ১৯৯৫ সাল থেকে ছোটদের কাগজ পত্রিকায় কালো জাদুকর উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে। পার্ল পাবলিকেশন্স ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একুশে বইমেলায় বইটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে।


শ্রাবণ মেঘের দিন ও গীত রচনা

১৯৯৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন লোক-নাট্যধর্মী শ্রাবণ মেঘের দিন। এটি তার নিজের রচিত একই নামের উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ। চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে এবং ২০০২ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের অধিভুক্ত সাইট অ্যান্ড সাউন্ড ম্যাগাজিনের করা জরিপে সমালোচকদের বিচারে এটি সেরা দশ বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের তালিকায় নবম স্থান অধিকার করে। এ ছাড়াও, ছবিটি সাতটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। এই চলচ্চিত্রের জন্য তার রচিত ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ এবং ‘আমার ভাঙা ঘরে’ গান দুটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রথম গানটিতে কণ্ঠ দিয়ে গায়ক সুবীর নন্দী শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

 

২০০০-এর দশক

২০০০ সালে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার রচিত উপন্যাস বৃষ্টিবিলাস। মধ্যবিত্ত পরিবারের টান পোড়ন নিয়ে লেখা বইটি সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের একটি। ২০০০ সালের ফেব্রæয়ারি মাসেই বইটির দ্বাদশ মুদ্রণ বের করতে হয়। ২০০১ সালে দুই দুয়ারী চলচ্চিত্র সব শ্রেণির দর্শকদের কাছে দারুন গ্রহণযোগ্যতা পায়। ছবিতে জাদু বাস্তবতার প্রকাশ পায় রিয়াজ অভিনীত রহস্য মানব চরিত্রের আশ্চর্য উপায়ে মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে। ২০০৩-এ নির্মাণ করে জমিদারদের কঠোর মনোভাব, বিলাসিতা আর শিল্পকর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে চিত্রিত চলচ্চিত্র চন্দ্রকথা। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ২০০৪ সালে নির্মাণ করেন শ্যামল ছায়া চলচ্চিত্রটি। এটি ২০০৬ সালে শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছিল। এ ছাড়াও, চলচ্চিত্রটি কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় তার রচিত যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস জোছনা ও জননীর গল্প।


বিবাহবিচ্ছেদ ও দ্বিতীয় বিবাহ

১৯৯০ সালের মধ্যভাগ থেকে তার কন্যা শীলার সমবয়সী এবং তার বেশ কিছু নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা জন্মে। এর ফলে সৃষ্ট পারিবারিক অশান্তির অবসানকল্পে ২০০৩ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং ওই বছরই শাওনকে বিয়ে করেন। এ ঘরে তাদের তিন ছেলে-মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যাটি মারা যায়। এ কন্যার নাম তিনি রাখতে চেয়েছিলেন লীলাবতী। ছেলেদের নাম নিষাদ ও নিনিত হুমায়ূন।

এ ছাড়াও, হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে ২০০৬ সালে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত দূরত্ব, বেলাল আহমেদ পরিচালিত নন্দিত নরকে এবং আবু সাইয়ীদ পরিচালিত নিরন্তর। ২০০৭-এ শাহ আলম কিরণ পরিচালিত সাজঘর এবং তৌকির আহমেদ নির্মাণ করেন বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র দারুচিনি দ্বীপ। এ সময়ে তিনি হাস্যরসাত্মক নয় নম্বর বিপদ সংকেত (২০০৭) এবং ত্রিভুজ প্রেমের গল্প নিয়ে আমার আছে জল (২০০৮) নির্মাণ করেন।
(সূত্র: উইকিপিডিয়া)। 

 

সেরা ৫ বই

দিঘির জলে কার ছায়া গো
কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অনন্য উপন্যাস দিঘির জলে কার ছায়া গো শুধু হিমু চরিত্র পছন্দকারীদের কাছে নয়, হুমায়ূন আহমেদের পাঠক গোষ্ঠীর প্রায় সব শ্রেণীর কাছেই উপন্যাসটি প্রশংসা কুঁড়িয়েছে। উপন্যাসের মূল চরিত্র মুহিব। মুহিবের ‘মুহি’ অক্ষর দুটি উল্টালে ‘হিমু’ হয়। নামের কারণে বা অন্য কোনো ভালো লাগা থেকেই হোক সে হিমু পাগল! অনেক সময় সে হিমুর মতো হতে চায়, খালি পায়ে হাঁটতে চায়, তার কর্মকান্ড অনুসরণ করতে চায়। হিমুর কিছু কিছু কথা তাকে প্রায় সময় সান্তনা দিয়ে থাকে। ‘দিঘির জলে কার ছায়া গো’ মূলত একটি নাটকের নাম। যে নাটকে মুহিব অভিনয় করেছিল। তার জীবনে নাটকে অভিনয় করাটা কাকতালীয়। এই নাটক থেকে অনেক সম্মান পেলে আর নাটক ছাড়তে পারেনি। অন্যদিকে মুহিবেরও হিমুর রূপার মতো রূপা আছে। তার নাম লীলা। লীলাই মুহিবের রূপা! তবে লীলার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এরপরও দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব অসাধারণ। মুহিব লীলার সাথে আনন্দ ঝলমলে দিন গুলো যখন কাটছিল তখনি নেমে আসলো এক কঠিন ঝড়। মুহিবের বাবাকে ধর্ষণের অভিযোগে জেলে নেয়া হয়। বাবাকে বাঁচাতে মুহিব বাড়ি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না। এভাবেই উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহিত হতে থাকে। বইটি হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় বই গুলোর একটি।

মধ্যাহ্ন প্রচ্ছদ
নান্দনিক কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস গুলোর মধ্যে মধ্যাহ্ন অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। দুই খন্ডের উপন্যাসটির প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে এবং এর দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ৪০৮ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি অখন্ড রূপে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের গল্প ১৯০৫ সালের গ্রামীন প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে। এ উপন্যাসের কাঠামোয় হুমায়ূন আহমেদ একটি ঐতিহাসিক পটভূমিকে পরোক্ষ করেছেন। উপন্যাসটি লেখকের জš§পূর্ববর্তী বিংশ শতাব্দীর একটি কালখন্ড পূর্ণ নির্মানের প্রয়াস মাত্র। ঐতিহাসিক পটভূমি হিসেবে বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের নেত্রকোনা অঞ্চলকে বেছে নিয়েছেন তিনি! উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র সফল সৎ ব্যবসায়ী হরিপদ সাহা। যিনি এক মুসলিম ছেলেকে আদর করার দায়ে সমাজচুত্য হন এবং পরবর্তীতে ঋষি সূলভ জীবন বেছে নেন। একি দায়ে দোষী হলে এলাকার ব্রাহ্মণ অম্বিকা ভট্টাচার্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর হয়ে যান। এ ছাড়াও, উপন্যাসে ফুটে উঠেছে তৎকালীন সময়ের বেশ্যালয়ের চিত্র। এলাকার কাঠ মিস্ত্রি সুলেমান তার স্ত্রী কে তালাক দিলে ঠিকানা হয় বেশ্যালয়। মধ্যাহ্ন শুরু থেকে শেষ অবধি আবর্তীত হতে থাকে নানাকাহিনীর সমন্বিত অবয়ব। উপন্যাসে বিশেষ পাওনা হিসেবে কখনো কখনো অতি অলৌকিকতা বা আধিভৌতিক ঘটনার জাদুকরি ছোঁয়া পাওয়া যায়। এ ছাড়াও, হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসটিতে তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট কিছু ঘটনা। যা উপন্যাসে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

দারুচিনি দ্বীপ
দারুচিনি দ্বীপ হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র শুভ্র সিরিজের বহুল পঠিত বই। ১৯৯১ সাথে প্রথম বই মেলায় প্রকাশিত হলে বইটি পাঠক মহলে খ্যতি অর্জন করে। উপন্যাসে কানাবাবা নামে খ্যত শুভ্র ও তার বন্ধু-বান্ধুরা মিলে সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার আয়োজন করতে দেখা যায়। যদিও উপন্যাসের শেষে তাদের আর সমুদ্র সৈকতে যাওয়া হয়নি। পুরো উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি তুলে ধরেছেন। শেষে সবার সমুদ্রে যাওয়ার উদ্দ্যেশে ট্রেনে উঠে উপন্যাসের ইতি করে। এই উপন্যাস অবলম্বনে ২০০৭ সালে ‘দারুচিনি দ্বীপ’ চলচিত্র নির্মাণ করা হলে দর্শক মন ভিন্ন নান্দনিকতার ছোঁয়া পায়।

ময়ূরাক্ষী
ময়ূরাক্ষী হুমায়ূন আহমেদের লেখা হিমু সিরিজের প্রথম উপন্যাস। ১৯৯০ সালে প্রথম প্রকাশিত হলে বিশেষ করে তরুণদের কাছে ব্যপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। জনপ্রিয়তার হাত ধরেই হিমু সিরিজের সূচনা। ময়ূরাক্ষী অর্থ ময়ূরের চোখ হলেও উপন্যাসে ময়ূরাক্ষী একটি নদীর নাম। যেটি হিমু স্বপ্নে দেখেছিল। এই নদীটি শুধু তার। এই নদীর রূপ পরিবেশ তার মনে গেঁথে গেছে।
(সূত্র: ইন্টারনেট)। 

মানবকণ্ঠ/এইচকে 




Loading...
ads




Loading...