জেনারেল এরশাদ : এক নিঃসঙ্গ প্রেমিক ও কবির গল্প

হাসনাত কাদীর



বিয়ের পর দূরে থাকা স্ত্রীকে প্রচুর চিঠি লিখতেন। সেসব চিঠি ছিল রোম্যান্টিকতায় পূর্ণ। যেন রোমিও কবির হৃদয় উজার করে লেখা পংতিমালা। চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে ডাকতেন, ‘হৃদয়ের রানী’, ‘হৃদয়ের ধন’, ‘ওগো মোর জীবন সাথী’, ‘খুশি বউ’, ‘খুশি পাগলী’, ‘সোনা বউ’, ‘খুকু বউ’, ‘ওগো দুষ্টু মেয়ে’, ‘নটি গার্ল’, ‘বিরহিনী’সহ কত মধুর মধুর নামে। ভাবতে পারেন, রোম্যান্টিক এই পত্রলেখক তখনকার এক সেনা কর্মকর্তা? চিঠির এই কবিই জেনারেল এরশাদ!

১৯৫৬ সালে ২৬ বছর বয়সী সেনা কর্মকর্তা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিয়ে করলেন কিশোরী রওশনকে। কিশোরীর ডাকনাম ডেইজি। বয়স মাত্র ১৩।

স্বভাবগত রোম্যান্টিকতায় এরশাদ জয় করে নিলেন কিশোরী বধূর হৃদয়। ভালোবেসে স্ত্রীকে ডাকতে থাকলেন কখনও ডেজু, কখনও ডেজুমনি, কখনও বা ডেজুরানী! রোম্যান্টিকতায় কম যান না ডেজুও। স্বামীকে 'পেয়ারা' বলে মধুর সুরে ডাকেন তিনি। আহা, কী সে রোম্যান্টিক সময়! কী সে মাতাল মাতাল হাওয়ায় ভেসে চলা!

কিন্তু প্রেম মানেই যে যন্ত্রণা! সেই বিচ্ছেদ যাতণা আসে এই নবদম্পতির জীবনেও। সেনা কর্মকর্তা স্বামীটিকে চাকরি সুবাদে এখানে সেখানে থাকতে হচ্ছে। আর পড়াশুনার জন্য কিশোরী রওশনকে বাবার বাড়ি ময়মনসিংহে। তবে বিচ্ছেদেই বাড়ে প্রেম। জমে যায়, হয়ে ওঠে আরও কোমল ও পেলব।

এরশাদ চিঠি লেখেন স্ত্রীর কাছে। মধুর মধুর সব সম্বোধনে। চিঠির শেষে নিজের পরিচয়ে লেখেন- ‘পেয়ারা পাগল সাথী’, ‘বড্ড একাকী একজন’, ‘প্রেম-পূজারি’, আমি ‘বিরহী’!

অনেক বছর পরে আত্মজীবনীতে এরশাদ লিখেছেন, বিয়ের পর সংসার করার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হয়। রওশন ওদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছিল। চাকরির জন্য আমি আজ এখানে, কাল ওখানে। সে সময় দূরে থাকা স্বামীরা স্ত্রীদের কাছে চিঠি পাঠাতো। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। বহু চিঠি লিখেছি; চিঠির প্রথমে রওশনকে অনেকভাবে ‘সম্বোধন’ করতাম।

৬২ বছরের সংসার জীবন। স্ত্রীকে নিয়ে বিশ্বের বহুদেশ ঘুরেছেন। ৯ বছর দেশ শাসন করেছেন। স্ত্রীকে রাজনীতিতে এনে এমপি, এমনকি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতাও বানিয়েছেন।

কিন্তু মানব জনম বড় রহস্যে মোড়া! একদিন যে প্রেমের জন্য জীবন বাজি ধরে মানুষ, সেই প্রেমও ফ্যাকাশে হতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর স্বর্ণালী দিনও হতে পারে বিবর্ণ তামাটে।

প্রেমিক এরশাদের জীবনে আসে নতুন রোম্যান্স, নতুন প্রেম। আসেন বিদিশা। বিদিশার নেশায় দিশেহারা এরশাদ হারান এতো বছরের সঙ্গী প্রিয় ডেজুরানীকে। ডেজু কি একাকী বসে নিরালায় কাঁদেন তখন রাত জেগে? আমাদের জানা হয় না। বিদিশার সঙ্গে বিয়ের পর এরশাদ গুলশানের বাসা ছেড়ে চলে যান প্রেসিডেন্ট পার্কে। সেই ঘরেও একদিন ঘুণ ধরে! হায় প্রেম! হায় মোহ! হায় মানুষের জীবন!

একদিন বিদিশার সঙ্গেও ছাড়াছাড়ি হলো। কবি কি তখন ডুকরে ডুকরে কাঁদেন আড়ালে? প্রেম ও প্রেয়সী ছাড়া কিভাবে ভালো থাকেন প্রেমিক পুরুষ? তিনি হয়ে ওঠেন একা, ভীষণ একা! এই নিঃসঙ্গতার দিনে প্রিয় ডেজু ওরফে রওশন তবু এক ছাদের নীচে ফিরে আসেন না। তবে রাজনীতিটা এখনো এরশাদ একই দলে করছেন। এ কেবল প্রবল প্রেমিক ও কবি হৃদয়ের পুরুষের পক্ষেই সম্ভব! অন্তত এই দেশে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি, পল্লীবন্ধু, বিশ্বপ্রেমিক ও মানবতার কবি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে তাই দেখা যায় প্রস্থানরত স্ত্রীর হাত ধরে কবিতা শোনানোর চেষ্টারত। হৃদয় খুঁড়ে শব্দ কুড়িয়ে লেখা কবিতায় তিনি বলতে চান, ‘রওশন আমার আলোর মৌমাছি।’ জেনারেল এরশাদ, এক নিঃসঙ্গ প্রেমিক ও কবি লেখেন-

নিঃসঙ্গ ধূসর বিশাল এক অন্ধকারে
আমি জেগে আছি
কোথায় উষার জ্যোতি
কতদূর আলোর মৌমাছি?

ব্যক্তিগত জীবনে মৃদুভাষী এবং মিষ্টি স্বভাবের এই কবির সংগীতের প্রতি আছে প্রবল অনুরাগ। কবিতার প্রতি অনুরাগ সেই কৈশোর থেকে। সেনা কর্মকর্তা থেকে সামরিক শাসক- বিপুল অভিজ্ঞতায় ব্যস্ত জীবন। এক জীবনে ক্ষমতা, প্রেমিকা, স্ত্রীরা সকলেই তাকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু কবিতা তাকে ছাড়েনি। তিনিও হয়ত সকল দুঃখের সঙ্গী করে নিয়েছেন তাই কবিতাকে। লিখে গেছেন ক্ষমতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দিনে। লিখে গেছেন প্রেম ও প্রেয়সীদের সংসার জীবনে। লিখেছেন তিনি সংসারহীন নিঃসঙ্গ জীবনে। লিখেছেন যখন ক্ষমতার রাজনীতির কোণঠাসা কালেও।

তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে, কনক প্রদীপ জ্বালো, এক পৃথিবী আগামী কালের জন্য, নির্বাচিত কবিতা, নবান্নে সুখের ঘ্রাণ, যুদ্ধ এবং অন্যান্য কবিতা, এরশাদের কবিতা সমগ্র, ইতিহাসে মাটির চেনা চিত্র, যেখানে বর্ণমালা জ্বলে, কারাগারে নিঃসঙ্গ দিনগুলো ইত্যাদি।

আগামীর বাংলাদেশ একজন স্বৈরশাসক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও দূরদর্শীতাহীন রাজনীতিবিদকে বিশ্লেষণ করতে তাঁর কবিতার দুয়ারে যাবে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে



Loading...
ads


Loading...