কবি তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো



  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৯ মার্চ ২০১৯, ১০:৫০

নাহ পারি না। কফিনের ডালার নিচে শুয়ে থাকা নিশ্চল কবিতার অন্তিম যাত্রায় আমি সামিল হতে পারিনি। আমি মানতে পারিনি তার জানাজা, তার দাফন। আর তাই পালিয়ে এসেছি চুপিসারে, সবার অলখে। মৃত্যু কেন আসে? কেন এই প্রয়ানের মহান দানব এসে থাবা দেয় বারবার আমাদের শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়। জন্মের পর মৃত্যু সে তো অমোঘ নিয়তি। কিন্তু তা মানতে আমাদের অন্তর সায় দেয় না কেন? কেন মনে হয়, কী এমন ক্ষতি হতো আর কয়েকটা দিন থেকে গেলে?

আল মাহমুদ মানেই তো কবিতা। আল মাহমুদ মানেই শব্দের তীর্থভূমি। বিধাতা, সত্য, সৌন্দর্য এবং পবিত্রতার এক কঠিন কষ্টের মেলবন্ধন। আল মাহমুদের যাত্রা কবিতার যাত্রা। শব্দের যাত্রা। আমি চিরকাল তার যাত্রার সাথী হতে চেয়েছি। কিন্তু তার এই যে না-ফেরার যাত্রা, এই যে চিরবিলীনের প্রত্যয়ধ্বনি এর সঙ্গে আমি একাত্ম হতে পারিনি কিছুতেই। তাই আমার পালিয়ে আসা।

কত স্মৃতি তার সঙ্গে। কত কথা। সেই শিল্পকলার মাঠে শেষ বিকেলে, ফজল ভাইয়ের হারুন এন্টারপ্রাইজের অফিসে, মগবাজার রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যারাতে- কত স্বপ্নের আনাগোনা, কত কবি ও কবিতার ধ্বনি। তার মহাপ্রস্থানের পর মনে পড়ছে সব একে একে আর আমি প্রবিষ্ট হচ্ছি ক্রমশ এক ভয়াল গভীর আলোছায়ার অভ্যন্তরে।

কি ছিলেন তিনি, কেমন ছিলেন তিনি- তা নিয়ে দুইদিকে কত রশি টানাটানি। রাজনীতির কত নোংরা কুটচাল। অথচ যাকে নিয়ে এই সব- তিনি কিন্তু মৃত্তিকার মতস্থির, পাহাড়ের মত অবিচল, তার স্থানে। আমরা, যারা খুব কাছে থেকে তাকে স্পর্শ করেছি, তারাই জেনেছি কতটা সারল্য ছিল তার অন্তরে। কতটা পাখি ও ফুলের চরিত্র বুকে নিয়ে মায়াবি পর্দায় দুলে উঠতো তার হৃদয়। আজীবন সংগ্রামী কবি খুব ভেঙে পড়েছিলেন নাদিরা ভাবির মৃত্যুতে।

ফজল ভাইকে জড়িয়ে ধরে তার সেই শিশুর মতো কান্নার দৃশ্য আজো আমার স্মৃতিতে অমলিন- যার সাক্ষী আমি, জাহাঙ্গীর ফিরোজ এবং জাকির আবু জাফর। ভালোবাসার ডুব সাঁতারে একটি আঁচলে বাঁধা এ কবিপুরুষ সেদিন থেকে পরিপূর্ণ নিমজ্জিত ছিলেন কবিতার প্রেমে। দানব মৃত্যু যেমন নাদিরা ভাবিকে কেড়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে তেমনি তাকেও কেড়ে নিল আমাদের কাছ থেকে, কবিতার কাছ থেকে।

আচ্ছা কবির কি মৃত্যু আছে? কবিরা কি প্রকৃতই বিলীন হয়ে যান অরণ্যে, সমুদ্রে কিংবা চির-কুয়াশায়? আমার তেমন মনে হয়নি কোনোদিন।
এই যে ফাজল ভাই, আমাদের প্রিয় কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, চার বছর ধরে শুয়ে আছেন বনানীতে, তিনিও কি চলে গেছেন আমাদের সান্নিধ্য থেকে? না যাননি। প্রত্যহ তার তীব্র উপস্থিতি আমাদের আত্মায়। তেমনি চলে যাবেন না আল মাহমুদ। আমরা তাকে প্রতিনিয়ত অনুভব করব আমাদের চিত্তে, আমাদের স্মৃতিতে এবং তার লেখা কবিতার প্রতিটি শব্দে, উচ্চারণে।

সোনালি কাবিনের কবি আজ নিজেই কবিতা। দ্বিতীয় ভাঙন থেকে পূর্ণাঙ্গ ভাঙনের দিকে যেতে যেতে মেঘবালিকার আত্মা অন্তরে ধারণ করে এ কবি হয়তো এখন দাবা খেলছেন নাদিরা ভাবির সঙ্গে কিংবা মক্তবের সেই চুল খোলা আয়েশা আক্তারের সঙ্গে চলছে তার কবিতার লুকোচুরি। আর আমরা, যারা তার স্মৃতি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি ক্রমাগত সময়ের পথ ধরে, তারা শুধু নিয়ত স্পর্শ করে যাচ্ছি আদমের মতো তার পবিত্র সুরাত আর নিমগ্ন হচ্ছি স্মৃতি সরোবরে।

শুয়োর মুখো ট্রাককে বেঁধে রাখার দুরন্ত সাহস বুকে এগিয়ে চলা ভাষার কবির ছোঁয়া পায়নি শহীদ মিনার, তাতে কি? ঈদগাহে হয়নি জানাজা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের কলম সৈনিক পাননি রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মান, বিউগল-ধ্বনি উচ্চারিত হয়নি তার শোক যাত্রায়, লাশের স্থান হয়নি বুদ্ধিজীবী কবরস্থানেও- তাতে কি হয়েছে এমন কোনো ক্ষতি? যে কালের কলস বয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি সেই মহাকাল সাক্ষী দেবে তার হয়ে। তার কর্মের স্বীকৃতি উঠে আসবে ইতিহাসে।

শতবর্ষ নয় হাজার বর্ষব্যাপী বেঁচে থাকবে তার কবিতা। কবির প্রতি এই নিষ্ঠুরতা শুধু আকাশের কান্না হয়েই ভেসে থাকবে না, ইতিহাসের খেরোখাতায় লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে ভয়ানক নিষ্ঠুরতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে। কবি, তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো। তোমার মহাযাত্রা আনন্দময় হোক, সুখময় হোক। কবিতার স্পর্শ লেগে থাক তোমার মেঘশরীরে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ



Loading...
ads


Loading...