শেখ সেলিমের অনন্য প্রকাশনা



  • ফরহাদ হোসেন
  • ১৮ মার্চ ২০১৯, ১২:৩৬

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন অতি পরিচিত, জনপ্রিয় এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। আজীবন নির্মোহ থেকে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন ধারণ ও সংহত করার কাজে নিয়োজিত এ রাজনীতিবিদ একজন ইতিহাস সচেতন মানুষও। অন্ততঃ তার সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, ঘটনাবহুল ইতিহাস’ সে তথ্যটিকেই প্রতিষ্ঠিত করে। একজন রাজনীতিবিদকে জনকল্যান নিয়ে যেভাবে ভাবতে হয়, যেভাবে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা করতে হয় ঠিক সেভাবেই তাকে হতে হয় ইতিহাস সচেতন। অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অর্জন-বিসর্জন সম্পর্কে তাকে যেমন জ্ঞাত হতে হয় ঠিক তেমনি সেই ঘটনা প্রবাহের নিরিখে তাকে নির্ধারণ করতে হয় ভবিষতের কর্মপন্থা, গতিপ্রকৃতি। অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া একজন রাজনীতিকের কর্তব্য আর সেই সব ইতিহাসের সাথে পরবর্তী প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয়া তার দায়িত্বের মধ্যেই বর্তায়।

জনাব সেলিম আলোচিত গ্রন্থে সেই কাজটিই করেছেন অত্যন্ত সুচারুভাবে গ্রন্থটির সূচনাতেই জনাব সেলিম ১৮ লাখ বর্গ মাইলের এ ভূখণ্ডটি নিয়ে ছোট একটি ভূমিকা উপস্থাপন করেছেন। এতে তিনি অন্যান্য বিষয়ের সাথে এ অঞ্চলের ধর্মীয় এবং ভাষাভিত্তিক পরিচয়, বিবর্তন ও অবস্থানকে অত্যন্ত অল্প কথায় ব্যক্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তার লেখার মধ্য দিয়েই আমরা জানতে পারি, অতিপ্রাচীন কালে এ অঞ্চলে বসবাস করত জড়বাদী পৌত্তলিকরা। এরাই এক পর্যায়ে হিন্দু নামে পরিচিত হয়। পরবর্তী সময়ে এখানে জন্মলাভ করে বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্ম। অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে এ অঞ্চলে আবির্ভাব ঘটে ইসলামের। এরপরে ক্ষুদ্রাকারে বিকশিত হয় খ্রিষ্টধর্ম। আমরা জানতে পারি, এ উপমহাদেশে প্রায় দুইশত ভাষা ও উপভাষা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিন্দি, উর্দু, তামিল, তেলেগু, বাংলা, অসমিয়া, রাজস্থান, পাঞ্জাবি, পশতু, গুজরাটি প্রভৃতি। জানতে পারি, এ অঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের পর ফারসি এবং স্থানীয় হিন্দি ভাষার সংমিশ্রনে জন্মলাভ ঘটে উর্দু ভাষার। সমগ্র উপমহাদেশে কোনো সর্বভারতীয় ভাষা না থাকলেও হিন্দি, বাংলা ও উর্দু অধিকাংশ মানুষের ভাষা।

আলোচ্য গ্রন্থে বরেণ্য এ রাজনীতিবিদ দীর্ঘ এক যুগের সাধনায় আমাদের সামনে তুলে এনেছেন এক অলিখিত অধ্যায়। ভারতবর্ষের জানা অজানার সে অধ্যায়টি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের শৌর্যে ভরা সে ইতিহাস অত্যন্ত সুনিপুন ভাবে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তার ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, ঘটনাবহুল ইতিহাস’ গ্রন্থে। প্রাচীনতম দ্রাবিড় থেকে শুরু করে সর্বশেষ ইংরেজ শাসন পর্যন্ত ইতিহাসের সকল চিত্রটিই সন্নিবেশিত হয়েছে এ গ্রন্থটিতে। আছে ভারতের জন্মকথা, গৌড়রাজ্য এবং স্বাধীন নরপতি শশাঙ্কের কথা, ঘোরিদের উত্থান কাহিনী, আলাউদ্দিন খিলজীর রাজ্য বিজয়, তুঘলক বংশের আবির্ভাব, তৈমুর লং এর ভারত আক্রমন, পানিপথের যুদ্ধ, মোঘল আমল, শিখদের উত্থান,পলাশীর যুদ্ধ, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, ফরায়েজী ওহাবী এবং তিতুমীরের আন্দোলন , লর্ড হেস্টিং এর বন্দোবস্ত, সিপাহী বিদ্রোহ, ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানী থেকে ব্রিটিশদের ক্ষমতা গ্রহন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, বাংলায় মুসলিম চেতনার উদ্ভব, বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস , মুসলিম লীগ আন্দোলনসহ ঐতিহাসিক সব ঘটনা প্রবাহ।

গ্রন্থটিতে আছে ক্ষুদিরাম বসু থেকে শুরু করে বাঘা যতীন, আলী আহমদ সিদ্দিকি, গিরিধারী লাল, হুসেন মুহম্মদ মুসতবা, অশ্বিনী কুমার বসু, পুলিন দাস, সত্যরঞ্জন বসু, প্রীতিলতা ওয়ার্দার, মাষ্টার দা সূর্যসেন প্রমুখ বিপ্লবীদের রোমাঞ্চকর ইতিহাস গাঁথা এ ছাড়াও গান্ধী যুগের সূচনা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, খিলাফত আন্দোলন, জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড, হিন্দু জাতীয়তাবাদ, নেহেরু রিপোর্ট, জিন্নাহর ১৪ দফা, ১৯৩৭ এর নির্বাচন , লাহোর প্রস্তাব, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, দিল্লি কনভেনশন, গান্ধিজীর সাথে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ এবং ভারত ও পাকিস্তান দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম— প্রভৃতি অধ্যায়কে তিনি তুলে এনেছেন অত্যন্ত নিপুন ভাবে। সমগ্র বইটিতে নির্মোহ থেকে প্রকৃত সত্য উত্ঘাটনের প্রচেষ্টা অত্যন্ত গভীর ভাবে লক্ষ্যনীয়। একজন রাজনীতিবিদ হয়েও জাতিকে ইতিহাস সচেতন করে গড়ে তোলার জন্য জনাব সেলিমের এই পদক্ষেপ একটি ঐতিহাসিক পথ নির্দেশ হয়ে থাকবে।

এ গ্রন্থটির মধ্যদিয়ে তিনি শুধু তার ইতিহাসপ্রিয়তার স্বাক্ষর রাখেননি, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে অতীতের আলোকে ভবিষ্যত্ কর্মপন্থা নির্ধারনের সুযোগ করে দিয়েছেন তার উত্তরসূরিদেরকেও। আজকের শিক্ষার্থী বিশেষ করে যারা ইতিহাসের ছাত্র তাদের কাছে গ্রন্থটি একটি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ



Loading...


Loading...