ছাত্রদলের কাউন্সিল ঘিরে চলছে লবিং-গ্রুপিং

ছাত্রদলের কাউন্সিল ঘিরে চলছে লবিং-গ্রুপিং
ছাত্রদলের কাউন্সিল ঘিরে চলছে লবিং-গ্রুপিং - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০৪

দীর্ঘ ২৭ বছর পর আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর শনিবার থেকে যাচ্ছে ছাত্রদলের ৬ষ্ঠ কাউন্সিল। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়াপার্সন কার্যালয় অথবা বিএনপির নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ইতোমধ্যে কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে বিএনপির মধ্যে চলছে ব্যাপক হিসাব-নিকাশ। দলের কেন্দ্রীয় নেতা এবং ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের মাঝে তৈরি হয়েছে নানা গ্রুপ।

পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করতে চলছে ব্যাপক লবিং আর তদবির। সেই সাথে ভোটারদের দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অফার। নগদ টাকার পাশাপাশি মোবাইল ফোন গিফট, ঢাকা যাতায়াতের বিমান টিকিটেরও অফার দেয়া হচ্ছে। ভোট না দিলে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকি দেয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে রাজনীতি কিভাবে করবেন সেটাও দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। বিএনপির সূত্র জানায়, দুটি বলয় দীর্ঘদিন ছাত্রদলকে নিয়ন্ত্রণ করে এলেও এবারের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। জুয়েল-হাবিব কমিটি ছিল বিএনপির নিখোঁজ সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী বলয়ের। কিন্তু এ্যানী-টুকু ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হয়ে রাজীব-আকরাম কমিটি গঠন করে। এ্যানী-টুকু নিজের বলয়কে শক্তিশালী করতে সব রেকর্ড ভেঙে ৭৩৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি করে। ছাত্রদলের বিশৃঙ্খলার জন্য এই বিশাল কমিটিই অনেকাংশে দায়ী। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছাত্রদলকে বলয়মুক্ত করতে নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে সার্চ কমিটি গঠন করেন।

এই কমিটির তত্ত্ববধায়নে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীরা কোনো প্যানেল দিতে পারবে না। তাই এ্যানী-টুকু এবার ভিন্ন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সভাপতি হিসেবে শ্রাবণকে আর এ্যানী সেক্রেটারি হিসেবে শাহনেওয়াজকে সাধারণ সম্পাদক আর প্রার্থী করে পৃথকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। এই বলয়কে সমর্থন দিচ্ছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য মির্জা আব্বাস, সাবেক সভাপতি আমানউল্লাহ আমান, ফজলুল হক মিলন, নাজিম উদ্দিন আলম, হাবিবুর রশিদ হাবিব, রাজীব আহসান, হায়দার আলী লেলিন, আমিরুজ্জামান খান শিমুল। তবে এ্যানী-টুকু বলয়ের সক্রিয় সদস্য শহীদুল ইসলাম বাবুলসহ অনেকেই এই বলয় থেকে এখন নিষ্ক্রিয়। কট্টর আওয়ামী পরিবারের সন্তান হিসেবে নীতিগতভাবে শ্রাবণের পরিবর্তে লিংকনকে প্রার্থী করার জন্য টুকুকে অনুরোধ করেছিলেন টুকু গ্রুপের সদস্যরা। কেননা শ্রাবণের বাবা যশোরের কেশবপুর আওয়ামী লীগের উপজেলা চেয়ারম্যান, এক ভাই থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, এক ভাই থানা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক, আর এক ভাই বর্তমান থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক। আওয়ামী পরিবারের একজনকে প্রার্থী করলে ভোটাররা মেনে নেবে না, মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হবে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে টুকু সবার মতামত উপেক্ষা করে শ্রাবণকে প্রার্থী করায় টুকু গ্রুপে ভাঙন ধরেছে, অনেকেই টুকু গ্রুপ থেকে বেরিয়ে গেছে। মাঠ পর্যায়ের নেতারাও শ্রাবণকে মেনে নিতে পারছে না।

ছাত্রদলের আরো পরীক্ষিত নেতা থাকার পরও বিতর্কিত শ্রাবণকে ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী করায় টুকুকে নিয়ে দলের মধ্যে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। কারণ টুকু পরিবারের অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় দলকে বহন করতে হচ্ছে। টুকু কেনো শ্রাবণের মতো আওয়ামী পরিবারের সন্তানকে ছাত্রদলের নেতৃত্বে আনার জন্য চেষ্টা করছে, এর পেছনে সরকারের বিশেষ সংস্থার হাত রয়েছে বলে অনেকে মনে করে।

অপরদিকে ইলিয়াস গ্রুপের জোরাল প্রার্থী ছিল আল মেহেদী তালুকদার। কিন্তু টুকু-এ্যানী কৌশলে বিবাহিতের অভিযোগে মেহেদীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে। ইলিয়াস গ্রুপে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় সভাপতি হিসেবে তারা ফজলুর রহমান খোকনকে ভেতরে ভেতরে সমর্থন দিচ্ছে। ইলিয়াস গ্রুপ সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে আমিনুর রহমান আমিন বা সাইফ মাহমুদ জুয়েলের মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে বেছে নিতে পারে। সভাপতি প্রার্থী হিসেবে সব থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের প্রার্থী ইলিয়াস গ্রুপ সমর্থিত হাফিজুর রহমান ও উত্তরাঞ্চলের ফজলুর রহমান খোকন। এদের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের একক প্রার্থী হিসেবে খোকনের রয়েছে বিশাল ভোটব্যাংক। তবে ভোটের হিসেবে পিছিয়ে নেই হাফিজও। তারও রয়েছে বিশাল পরিচিতি এবং ভোট ব্যাংক। বিএনপির স্থায়ী কমিটির নবীন সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের সব নেতাকে ঐক্যবদ্ধ করে খোকনের পক্ষে মাঠে নামিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলও খোকনের পক্ষে কাজ করছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন শীর্ষ নেতাও খোকনের প্রতি সমর্থন রয়েছে। এদিকে যুবদলের নীরব-টুকুর দ্ব›দ্ব ছাত্রদলের কাউন্সিলে প্রভাব ফেলেছে। শ্রাবণের পক্ষে টুকু যেখানেই ভোটের জন্য ফোন করছে পরক্ষণেই নীরব খোকনের পক্ষ হয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাচ্ছে। ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, আমিরুল ইসলাম খান আলীম উত্তরাঞ্চলের নেতা হিসেবে সুকৌশলে খোকনের জন্য একদিকে যেমন ইলিয়াস গ্রুপের সমর্থন জোগাড় করছে, তেমনই সাইফুল আলম নীরব, আব্দুল বারী ড্যানি, বেনজীর আহমেদ টিটু, আহমেদ আযম খানসহ টুকু বিরোধী সব নেতাকে খোকনের পক্ষে মাঠে নামিয়েছে। সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনেরও সমর্থন রয়েছে খোকনের প্রতি। টুকু গ্রুপ থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি আব্দুল মতিন, আবু সাইদও খোকনের জন্য মাঠে নেমেছে। কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তাইফুল ইসলাম টিপু, ওবায়দুর রহমান চন্দনও ভোট চাইছেন। সদ্যবিদায়ী ছাত্রদলের সহসভাপতি, তরিকুল ইসলাম টিটু, নাজমুল হাসান, আব্দুল ওয়াহাব, নূরুল হুদা বাবু সবাই মাঠে নেমেছে। টুকু-এ্যানীর সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ার জন্য অনেকেই খোকনকে সমর্থন দিচ্ছে। বিএনপির তীর্থস্থান বলে খ্যাত বগুড়ার সন্তান হিসেবে খোকনকে নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। হাবিব-রাজীবের প্রার্থী হিসেবে জাকিরুল ইসলাম জাকিরও আলোচনায় রয়েছে। পর্দার আড়ালে সাধারণ সম্পাদক নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে কে হবে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। শাহনেওয়াজ, আমিন, জুয়েল না শ্যামল তা দু-একদিনের মধ্যে জানা যাবে। তবে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শাহনেওয়াজকে সমর্থন দিচ্ছে নোয়াখালী অঞ্চলের বরকতউল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ, বেলাল আহমেদ।

ছাত্রদলের কাউন্সিলে উড়ছে কালো টাকা: এদিকে ছাত্রদলের কাউন্সিলকে কেন্দ্র কালো টাকা উড়ছে বলে শোনা যাচ্ছে। অথচ সারাদেশে হামলা-মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মী ঘরে থাকতে পারে না। ঠিকমতো দু-মুঠো খাবারও জোটে না অনেকের। অনেকেই এলাকা ছেড়ে ঢাকায় এসে বাসায় দারোয়ান বা রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতাকর্মীদের এমন জীবনের করুণ চিত্র বর্ণনা করে প্রকাশ্যে চোখের অশ্রæ ঢেলেছেন। কিন্তু ছাত্রদলের কাউন্সিলে টাকা ওড়াচ্ছে একটা সিন্ডিকেট! এই টাকার উৎস কোথায়?। ছাত্রদলের কাউন্সিলকে সামনে রেখে বিমানে করে ঘুরে-ফিরে ভোট চাচ্ছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। ঢাকার নামিদামি হোটেলে রুম বুক করে কাউন্সিলরদের থাকার জন্য ব্যবস্থা করছে। অঞ্চল ভেদে নামিদামি স্মার্ট ফোনসেট গিফট করছে কাউন্সিলরদের, মোটা অঙ্কের টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে।

ভবিষ্যতে যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তর্ভুক্তির লোভ দেখাচ্ছে। কাউকে কাউকে হুমকি দেয়া হচ্ছে ১৪ তারিখের পর দেখে নেয়ার। অবাধ এবং নিরপেক্ষ, কালো টাকা মুক্ত নির্বাচনের জন্য বিএনপি দীর্ঘদিন আন্দোলন করছে, ছাত্রদলের কাউন্সিলে কালো টাকা, পেশিশক্তি দেখিয়ে নিজের বলয়ের প্রার্থিকে জয়ী করতে উঠে-পড়ে লেগেছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট বিগত সময়ে কমিটি বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখনো তারাই কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে টাকা লগ্নি করছে। কেউ কেউ ভিন্ন উৎস থেকে টাকা আসছে বলে জানায়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান পাঁচ মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে ভোটের মাধ্যমে নিরপেক্ষ কমিটি গঠনের। তার সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে এই সিন্ডিকেট। দক্ষিণাঞ্চলের আওয়ামী লীগ নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতার আপন ভাইকে ছাত্রদলের সভাপতি বানাতে আয়েশি ইন্তেজাম! টাকার ছড়াছড়ি! গুম-খুন, হামলা-মামলায় জর্জরিত বিএনপি একটা নতুন আগামীর প্রত্যয়ে ছাত্রদলের ৬ষ্ঠ কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের যে প্রত্যাশা করেছিল। সেই কাউন্সিলে থাবা মেরেছে কালো টাকা।

বিভিন্ন সংস্থা এই টাকা লগ্নি করে ছাত্রদলকে বিনাশ করতে চায়, বিএনপিকে জমিন থেকে চিরতরে মুছে দিতে চায়। ছাত্রদলের আসন্ন কাউন্সিলে কালো টাকার এই নজির উপস্থাপন করে সিন্ডিকেট দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলেই বন্দি রেখে দেশনায়ক তারেক রহমানের বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তনের পথটা রুদ্ধ করে বিএনপিকে ওরা মুছে দিতে চায়। ওরা এতদিন গোপনে বিএনপি বিনাশের কাজ করেছে আর এখন করছে দিনের আলোয়।

ছাত্রদলের একজন প্রার্থী অভিযোগের সুরে বলেন, আমরা যারা কোনো সিন্ডিকেট সদস্য নই, কোনো বড় ভাই নেই, দলের জন্য নিস্বার্থভাবে কাজ করছি, তাদের জন্য এই কাউন্সিল হতাশার। একটি সিন্ডিকেট কাউন্সিলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। তবে বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, কেউ কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই সিদ্ধান্ত নেবেন। কেননা তিনি সব বিষয়ে অবগত। ছাত্রদলের কাউন্সিলকে ঘিরে কেউ চক্রান্ত করলে তারই ক্ষতি হবে।

মানবকণ্ঠ/এএম

 




Loading...
ads




Loading...