সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহীরা ছুটছেন তৃণমূলে



  • সাইফুল ইসলাম
  • ১২ জুন ২০১৯, ১০:৫১

আর মাত্র কয়েক মাস পরই অনুষ্ঠিত হবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল। জাতীয় সম্মেলনকে ঘিরে দেশ জুড়ে পুরোদমে সাংগঠনিক তত্পরতা শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের মেলে ধরার চেষ্টা করছেন। রাজনীতিতে ধারাবাহিকতা ধরে দলে ও সরকারে বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন আগ্রহীরা। আগামী সম্মেলনকে ঘিরে দলের ৭-৮জন নেতার তত্পরতাও বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সরকারি বা বেসরকারি অনুষ্ঠানে তারা অংশ নিচ্ছেন। তবে ২০তম জাতীয় কাউন্সিল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক পদে পেয়েছে নয়জনকে। বর্তমান ওবায়দুল কাদের দলটির নবম সাধারণ সম্পাদক। তার আগে আরো আটজন বিভিন্ন সময়ে দলটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাদের মধ্যে থেকে অনেকে আবার দুইবারও দায়িত্ব পালন করেছেন। আগামী সম্মেলনে বর্তমান সাধারণ সম্পাদকই থাকছেন নাকি নতুন আরেকজন যুক্ত হচ্ছেন এই নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে আলোচনার ঝড়। জানা গেছে, সম্মেলনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের অন্তত ৭-৮জন নেতা তাদের কর্মকাণ্ডে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ও সারা দেশের নেতাকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রতিবারই আকর্ষণের জায়গা তৈরি হয় দলের সাধারণ সম্পাদক পদকে ঘিরে। দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় দলের অন্য নেতারা নড়েচড়ে বসেছেন। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শারীরিকভাবে সুস্থ হয়েছেন। এ পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। ইতোমধ্যে ওবায়দুল কাদের দেশে ফিরে এসেছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ওবায়দুল কাদেরের প্রাণশক্তি কমেনি। তারপরও বয়স বিবেচনায় সরকার ও দলের গুরু দায়িত্ব পালন নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে বলে মনে করেন অনেকে।

জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আট বিভাগে একযোগে সাংগঠনিক সফর করছে দলটি। পাশাপাশি জেলা-উপজেলায় সম্মেলনও করছে তারা। সাংগঠনিক সফর ও সব মহানগর-জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সম্মেলন শেষে অক্টোবরে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর দলটির সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে হিসাবে আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এই বছরের ২৩ অক্টোবর। একারণেই অক্টোবরেই আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দলটির কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেই।

যারা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন: আওয়ামী লীগের ৬৭ বছরে অনুষ্ঠিত গত ১৯টি কাউন্সিলে এ দলটির কারা হাল ধরেছেন। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে জন্মলাভের পর ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় কাউন্সিলে একই কমিটি বহাল থাকে। ’৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনকে ঘিরে মওলানা ভাসানী দল ভেঙে ন্যাপ করলে আওয়ামী লীগের মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অপরিবর্তিত থাকেন। ’৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ ৬ বছর পর ’৬৪ সালে দলকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সাধারণ সম্পাদক পদে মুজিব অপরিবর্তিত থাকেন। ’৬৬ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। এরপর ’৬৮ ও ’৭০ সালের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এই কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ’৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সভাপতি হন এ এইচ এম কামরুজ্জামান। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জিল্লুর রহমান বহাল থাকেন। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবারো স্থগিত করা হয়। ’৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হন। ’৭৭ সালে এই কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক হন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। ’৭৮ সালের সম্মেলনে আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক হন। ’৮১ সালের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে সভাপতি এবং আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন। এরপর শেখ হাসিনা দেশে ফিরে ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটির হাল ধরেন। ’৮৩ সালে আবদুর রাজ্জাক দলত্যাগ করে বাকশাল গঠন করলে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ’৮৭ সালের সম্মেলনে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হন। ’৯২ ও ’৯৭ সালের সম্মেলনে জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০০ সালের বিশেষ কাউন্সিলেও একই কমিটি বহাল থাকে। এরপর ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন প্রয়াত নেতা আবদুল জলিল। ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ১৮তম কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আর ওই কাউন্সিলে বাঘা বাঘা নেতাদের সাইড লাইনে রেখে অপেক্ষাকৃত তরুণদের নিয়ে গঠন করেন চমকের কেন্দ্রীয় কমিটি। ২০১২ সালের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম পুনর্নিবাচিত হন। ২০১৬ সালের অনুষ্ঠিত দলের ২০তম কাউন্সিলে অষ্টমবারের মতো সভাপতি পদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ওবায়দুল কাদের।

যারা আলোচনায়- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য অনেক নেতাই আগ্রহী রয়েছেন। সকলেই দলের সভাপতির দিকে চেয়ে আছেন। তবে এরই মধ্যে বেশ কয়েক জনকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ময়দানে। শুরু হয়েছে ঝল্পনা। আবার অনেকেই কল্পনাতে বসে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে। যাদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তারা হলেন, আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, ডা. দীপু মনি, সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তবে সাধারণ নেতারা ভাবছেন অন্য কিছু। নেত্রী চাইলে এদের বাহিরেও কাউকে সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে বসাতে পারেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস



Loading...
ads


Loading...